এলার্জি (Allergy) ও আধুনিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাঃ
-----------------------------------------------------------
বিশ্বব্যাপী দেখা সবচেয়ে সাধারণ রোগ-অবস্থাগুলির একটি হল এলার্জি। ২০-তম শতকের শুরুতে এটি একটি বিরল রোগ বলে বিবেচিত হয়েছিল, সাম্প্রতিক কালে এলার্জি একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য-সমস্যা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, যে কোন দেশের ১০ থেকে ৪০% মানুষ এলার্জিজনিত সমস্যায় ভুগে।
যাদের এলার্জি আছে, তাদের খুব সাবধানে থাকতে হয়। সামান্য এদিক–সেদিক হলেই শুরু হয়ে যায় চুলকানি, চোখ লাল, ত্বকে লালচে দানা ওঠা ইত্যাদি। এলার্জি আছে এমন অনেকেরই ঘর ঝাড়ামোছা করলেই ত্বকে চুলকানি শুরু হয়ে যায়। আবার কারও কারও ধুলাবালির সংস্পর্শে এলেই ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। কোনো কোনো ওষুধের এলার্জিতে তো জীবন–সংশয়ও দেখা দিতে পারে। ধুলাবালি ছাড়াও কোনো বস্তুর প্রতি অতি সংবেদনশীলতার কারণেও এলার্জি হতে পারে। যেমন ধাতব অলংকার, প্রসাধনসামগ্রী, কোনো রাসায়নিক, ডিটারজেন্ট, সাবান, পারফিউম, প্লাস্টিকের তৈরি গ্লাভস বা বস্তু, গাছ, ফুলের রেণু, ওষুধ, সিনথেটিক কাপড় ইত্যাদি। এ সমস্যা জন্মগত ও পারিবারিক কারণে হতে পারে। বিশেষ বস্তুতে এলার্জির ক্ষেত্রে ওই বস্তুর সংস্পর্শে এলে শরীরে হিস্টামিন, সেরোটনিন ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। এর ফলে ত্বকে চাকা, ত্বক লাল, চুলকানি, চোখ লাল বা চোখে চুলকানি ইত্যাদি হতে পারে। কারও কারও শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানিও হতে পারে। নাক বন্ধ, নাক দিয়ে পানি পড়ার সমস্যাও থাকতে পারে। তীব্র প্রতিক্রিয়া হলে রোগী অচেতন হয়ে পড়তে পারেন।
এলার্জি কি-
প্রত্যেক মানুষের শরীরে এক একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম (Immune System) থাকে। এলার্জি হচ্ছে ইমিউন সিস্টেমের একটা দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা যা পরিবেশের কোনো এলার্জেন (Allergen) বা এমন কোন বস্তু বা উপাদান যার কারণে মানুষের শরীরে হাইপারসেনসিটিভ রিয়েক্ট দেখায় কিংবা অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এলার্জিক রিয়েকশনঃ কোন এলার্জেন শরীরের সংস্পর্শে এলে শরীরে যে সব অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়, তাকে এলার্জিক রি-অ্যাকশন বা হাইপারসেনসিটিভ রিয়েকশন (Hyper-sensitivity Reaction) বলে। এই এলার্জিক রিয়েকশন বা হাইপারসেনসিটিভ রিয়েকশন কে চার ভাগে ভাগ করা হয়। তবে এই চার প্রকারের মধ্যে, এলার্জি বলতে সাধারনত টাইপ-১ হাইপারসেনসিভিটি কে বুঝানো হয়ে থাকে। যখন কোন এলার্জেন দ্বারা শরীরের যেসব হাইপারসেনসিটিভিটি রি-একশন দেখা যায়, তাকে টাইপ-১ হাইপারসেনসিটিভিটি রি-একশন বলা হয়।
এলার্জি আমাদের শরীর সবসময়ই ক্ষতিকর বস্তুকে (পরজীবী, ছত্রাক, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া) প্রতিরোধের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টাকে রোগ প্রতিরোগ প্রক্রিয়া বা ইমিউন বলে। কিন্তু কখনও কখনও আমাদের শরীর সাধারণত ক্ষতিকর নয়, এমন অনেক ধরনের বস্তুকেও ক্ষতিকর ভেবে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন সব বস্তুর প্রতি শরীরের এই অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে এলার্জি বলা হয়। এলার্জি সৃষ্টিকারী বহিরাগত বস্তুগুলোকে এলার্জি উৎপাদক বা এলার্জেন বলা হয়।
এলার্জিজনিত প্রধান সমস্যাসমূহঃ
১. এলার্জিজনিত সর্দি বা এলার্জিক রাইনাইটিস (Allergic Rhinitis): এর উপসর্গ হচ্ছে অনবরত হাঁচি, নাক চুলকানো, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, কারো কারো চোখ দিয়েও পানি পড়ে এবং চোখ লাল হয়ে যায়।
এলার্জিক রাইনাইটিস দুই ধরনের- সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস যা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে হয়ে থাকে। পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস যা রোগী সারাবছর ধরে ভুগতে থাকে।
এলার্জিক রাইনাইটিস এর লক্ষণ ও উপসর্গ-
সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস : ঘন ঘন হাঁচি নাক দিয়ে পানি পড়া নাসারন্ধ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া এছাড়াও অন্যান্য উপসর্গসমূহ চোখ দিয়ে পানি পড়া।
পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস : পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিসের উপসর্গগুলো সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিসের মতো। কিন্তু এক্ষেত্রে উপসর্গগুলোর তীব্রতা কম হয় কিন্তু স্থায়িতকাল বেশি হয়।
২. এ্যাজমা বা হাঁপানিঃ এর উপসর্গ হচ্ছে কাশি, ঘন ঘন শ্বাসের সঙ্গে বাঁশির মতো শব্দ হওয়া বা বুকে চাপ চাপ লাগা, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝেই ঠান্ডা লাগা। এ্যাজমা রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণগুলো হলো- বুকের ভেতর বাঁশির মতো সাই সাই আওয়াজ শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট, দম খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম দিতে না পারা ঘনঘন কাশি, বুকে আটসাট বা দম বন্ধ ভাব, রাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকা।
৩. আর্টিকেরিয়া (Urticaria): আর্টিকেরিয়ার ফলে ত্বকে লালচে ফোলা ফোলা হয় এবং ভীষণ চুলকায়। ত্বকের গভীর স্তরে হলে মুখে, হাত-পা ফুলে যেতে পারে। আর্টিকেরিয়ার ফলে সৃষ্টি ফোলা অংশসমূহ মাত্র কয়েকঘণ্টা স্থায়ী থাকে কিন্তু কখনও কখনও বার বার হয়। যে কোনো বয়সে আর্টিকেরিয়া হতে পারে। তবে স্বল্পস্থায়ী আর্টিকেরিয়া বাচ্চাদের মধ্যে এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্টিকেরিয়া বড়দের মধ্যে দেখা যায়।
৪. সংস্পর্শজনিত এলার্জিক ত্বক প্রদাহ/এলার্জিক কনটাক্ট ডারমাটাইটিস (Contact Dermatitis): চামড়ার কোথাও কোথাও শুকনো, খসখসে, ছোট ছোট দানার মতো উঠা। বহিঃস্থ উপাদান বা এলার্জেনের সংস্পর্শে ত্বকে হলে তাকে এলার্জিক কনটাক্ট ডারমাটাইটিস বলা হয়।
লক্ষণ ও উপসর্গ : ত্বকে ছোট ছোট ফোসকা পড়ে ফোসকাগুলো ভেঙ্গে যায় চুয়ে চুয়ে পানি পড়ে ত্বকের বহিরাবরণ উঠে যায় ত্বক লালচে হয়ে এবং চুলকায়, চামড়া ফেটে আঁশটে হয়।
৫. একজিমা (Eczema): একজিমা বংশগত চর্মরোগ যার ফলে ত্বক শুস্ক হয়, চুলকায়, আঁশটে এবং লালচে হয়। খোঁচানোর ফলে ত্বক পুরু হয় ও কখনও কখনও উঠে যায়। এর ফলে ত্বক জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত ত্বক থেকে চুয়ে চুয়ে পানি পড়ে এবং দেখতে ব্রণ আক্রান্ত বলে মনে হয়। এটা সচরাচর বাচ্চাদের মুখে ও ঘাড়ে এবং হাত ও পায়ে বেশি দেখা যায়।
৬. এলার্জিক কনজাংটাইভাইটিস (Allergic Conjuctivitis): চোখে চুলকানি ও চোখ লাল হযে যায়।
৭. খাবারজনিত এলার্জিঃ পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া এবং ডায়রিয়া।
৮. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত এলার্জিঃ এটা খুবই মারাত্মক। এলার্জেন শরীরের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে এটা শুরু হয়ে যেতে পারে। নীচে উল্লেখিত উপসর্গগুলো হতে পারে। চামড়া লাল হয়ে ফুলে উঠে ও চুলকায়, শ্বাসকষ্ট, নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাঁশির মতো আওয়াজ হয় মূর্ছা যেতে পারে, রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে।
সাধারণ এলার্জি উৎপাদকসমূহঃ
মাইট মোল্ড ফলের রেণু বা পরাগ ঠান্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়া, খাদ্যদ্রব্য ঘরের ধুলো ময়লা প্রাণীর পশম এবং চুল পোকা-মাকড়ের কামড় ওষুধসহ কিছু রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রসাধন সামগ্রী, উগ্র সুগন্ধি বা তীব্র দুর্গন্ধ।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাঃ
১. রক্ত পরীক্ষা (Blood test): বিশেষত রক্তে ইয়োসিনোফিলের মাত্রা বেশি আছে কিনা তা দেখা।
সিরাম আইজিইর মাত্রা (Serrum Ige level test) : সাধারণত এলার্জি রোগীদের ক্ষেত্রে আইজিইর মাত্রা বেশি থাকে।
২. স্কিন প্রিক টেস্ট : এই পরীক্ষায় রোগীর চামড়ার উপর বিভিন্ন এলার্জেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এই পরীক্ষাতে কোন কোন জিনিসে বা উপাদানে রোগীর এলার্জি আছে তা ধরা পড়ে।
৩. প্যাচ টেস্ট (Patch Test) : এই পরীক্ষায় রোগীর ত্বকের উপর।
৪. বুকের এক্সরে (Chest X-ray) : হাঁপানি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই বুকের এক্সরে করে নেয়া দরকার যে অন্য কোনো কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা।
৫. স্পাইরোমেট্রি (Spirometry) বা ফুসফুসের ক্ষমতা দেখা : এই পরীক্ষা করে রোগীর ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায়।
এলার্জির চিকিৎসাঃ
এলার্জেন পরিহার : যখন এলার্জির সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তা পরিহার করে চললেই সহজ উপায়ে এলার্জি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এলার্জির হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাঃ
এলার্জির জন্যে হোমিওপ্যাথিতে সবচেয়ে ভালো ও উপযুক্ত চিকিৎসা রয়েছে। হোমিওপ্যাথি রোগের নামে নয়, রোগীর সামগ্রীক রোগ লক্ষণের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করে থাকে। রোগীর ইমিউন সিস্টেম এর দুর্বলতার কারণে এলার্জিক রি-একশন দেখা দেয়। প্রতিটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মানবদেহের ভাইটাল ফোর্স বা ইমিউন সিস্টেমের উপর কাজ করে ইমিউন সিস্টেম কে শক্তিশালী করে থাকে। আর ইমিউন সিস্টেম যত শক্তিশালী হবে রোগী এলার্জিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে থাকবে। যেহেতু এলার্জির লক্ষণগুলোর রোগীভেদে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়, সেক্ষেত্রে রোগীর সামগ্রীক লক্ষণ বিবেচনা করে সঠিক হোমিওপ্যাথিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা ও শক্তিতে রোগীর উপর প্রয়োগ করা হলে রোগী খুব দ্রুতই আরোগ্য হয়ে উঠে। তবে অবশ্যই একজন ভালো, উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
হোমিওপ্যাথিতে রোগীভেদে এলার্জিজনিত বিভিন্ন সমস্যা বা লক্ষণের উপর অনেক মেডিসিন আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
1. Arsenic Album
2. Arsenic Iodatum
3. Apis Mel
4. Allium Cepa
5. Belladonna
6. Euphrasia
7. Natrum Mur
8. Natrum Sulph
9. Calcarea Sulph
10. Silicea
11. Graphitis
12. Petroleum
13. Merc Sol
14. Hepar Sulph
15. Kali Bichrome
16. Kali Iodatum
17. Dolicos
18. Euphorbinum
এছাড়া আরো অনেক মেডিসিন আছে যা রোগীর শারীরিক ও মানসিক লক্ষণের উপর ভিত্তি করে সিলেকশন করা হয়ে থাকে।


Comments